নাভাহো (Navajo) উপজাতির সেকাল ও একাল - একটি ভৌগোলিক পর্যবেক্ষণ


    ড. মনীষা দেব সরকার 

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস / ভূগোল নিয়ে পড়তে গিয়ে সভ্যতার যে জয়ধ্বনি শোনা যায় তা হলো আমেরিকার আদিম (primitive) সমাজের ওপর 'উৎপাদন' বা 'manufacturing' ধর্মী সভ্যতার প্রতিপত্তি। এই সভ্যতার প্রসার ঘটেছিল পূর্ব থেকে পশ্চিমে। যেন একটি লম্বা রেখা বরাবর যার একদিকে আধুনিক সভ্যতা অন্যদিকে শতাব্দী প্রাচীন আদিম মানুষের দিন-যাপনের ইতিহাস!! এই অদৃশ্য রেখা ক্রমশঃ সরে গেছে পশ্চিমে আধুনিকতার শক্তি দম্ভ নিয়ে -- বিনাশ করার চেষ্টা করেছে তাদের এই মহাদেশে পা রাখার বহু যুগ আগে থেকেই যারা বসবাস করছিল তাদের যাবতীয় সংস্কৃতি ইতিহাসকে। Fredericke Jackson Turner আমেরিকার এই দৈশিক  প্রসারকে তাঁর গবেষণায় ব্যাখ্যা করেছেন একটা যুদ্ধের দৃষ্টিভঙ্গিতে। অদৃশ্য বিভাজন রেখাটি যেন 'frontline' আর যারা পূর্ব থেকে পশ্চিমে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছে তারা 'Frontier People' 1893 সালে তাঁর এই গবেষণা তত্ত্ব (thesis) তিনি আখ্যা দেন 'Frontier Theory' F. J. Turner নিজে ছিলেন একজন আমেরিকান ইতিহাসবিদ। 1932 সালে তার প্রয়াণ হয়। টার্নারের মতে পূর্ব থেকে পশ্চিমে আমেরিকার সভ্যতার প্রসার শুধুমাত্র একস্থান থেকে অন্যস্থানে বাহ্যিক গমন নয় বরং এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বর্তমান আমেরিকার গণতন্ত্র সংস্কৃতি। 'পশ্চিম' তাঁর মতে 'Wild West' - যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বর্তমান আমেরিকার সংস্কৃতি। যুদ্ধ যত এগিয়েছে 'Frontline' ততই অদৃশ্য রেখার মতো পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেছে।


নাভাহোদের দেশ 

দেশ দখলের ইতিহাস পৃথিবীর সর্বত্রই প্রায় এক। কি আমেরিকার ক্ষেত্রে কি অন্যত্র সাদা চামড়ার লোকেরা চেষ্টা করেছে তাদের উন্নত অস্ত্র বলে কোনদেশের মানুষদের দাস বা slave পরিণত করতে এবং তাদের জন্মলব্ধ অধিকারকে খর্ব বা বিনাশ করে নিজেদের আধিপত্য স্থাপন বিস্তার করতে। নাভাহো মানুষদের নিয়ে দাস হিসেবে ঐতিহাসিক 'Long March' তার প্রমাণ।

  

নাভাহো পতাকা
USA র পতাকা ও নাভাহোদের পতাকা, পিছনে মনুমেন্ট ভ্যালি
 
বর্তমানে উত্তর আমেরিকার আদিম জনজাতিকে 'Native Americans' বলা হলেও আগে এরা 'Red Indians' নামেই পরিচিত ছিল। এরাই আমেরিকার আদিম জনসাধারণ বা indegenous people 1492 সাল থেকে আমেরিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশের সূত্রপাত হওয়ার পর থেকে এই আদিম অধিবাসীদের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে। এর প্রধান কারণ ঔপনিবেশিকরা নানা ধরনের রোগ জীবাণু নিয়ে আসে যার সঙ্গে এরা পরিচিত ছিল না। আর যুদ্ধের সময় biological weapons পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়। এইভাবে Native Americans রা তাদের পূর্বপুরুষদের ভূমি থেকে উৎখাত হয়েছে। এক পেশে সরকারি নীতিও এর জন্য দায়ী।

এরপর নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে আদিম জনজাতি বর্তমান USA তে নিশ্চিত স্থান স্বীকৃতি পায়। প্রাথমিকভাবে USA এদের semi independent বলে। ইউরোপীয়দের থেকে পৃথক করার চেষ্টাও করেছে। আজ পাঁচ মিলিয়নের বেশি নেটিভ আমেরিকান এখানে বসবাস করছে আলাস্কা, ওকলাহোমা, আরিজোনা, ক্যালিফোর্নিয়া, নিউ মেক্সিকো টেক্সাস রাজ্যে।

উত্তর আমেরিকার এই জাতির প্রাচীন ইতিহাস অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। নৃতত্ত্ববিদ্‌ আলফ্রেড ক্রোবার (Alfred Kroeber) এই ইতিহাসের বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর মতে নেটিভ আমেরিকানদের আমেরিকায় আগমন প্রায় 10,000 বছর আগে শুরু হয়েছিল। এই অভিপ্রয়াণ বা migration কয়েক শতক ধরে Beringia নামক ভূখণ্ডের উপর দিয়ে হয়েছিল। Beringia ছিল সাইবেরিয়া আলাস্কার মধ্যভাগের ভূমিভাগ। এই ভূমিভাগ দুটি মহাদেশের মধ্যে (এশিয়া উত্তর আমেরিকা) সেতুর মতো কাজ করেছিল। বর্তমানে এই স্থানে Bering Strait অবস্থান করছে কারণ তুষার যুগ (Ice Age) শেষ হয়ে গেলে তার গলিত জল সমুদ্রের জলের উচ্চতা বহুলাংশে বর্ধিত করে ফলে বেরিনজিয়া ভূখণ্ড নিমজ্জিত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণাদি থেকে জানা যায় এই অঞ্চল থেকে মানুষের অভিপ্রয়াণ শুরু হয় প্রায় পঁচিশ হাজার বছর আগে এবং শেষ হয় বারো হাজার বছর আগে। এরা মূলতঃ পূর্ব দক্ষিণ দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। 8000 BCE তে জলবায়ু কিছুটা স্থিতিশীল হয় আর এই সময় থেকেই এই অঞ্চলের মানুষেরা তৈরি করে এক শিকারি - সংগ্রাহকদের (hunter - gatherer) বৈচিত্র্যময় সমাজ। 

বর্তমানে নেটিভ আমেরিকানরা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক অনন্য সম্পর্কে আবদ্ধ।1960 এর দশকের শেষ ভাগে এদের সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের প্রভূত প্রসার লাভ করে। এদের উপস্থিতি ছড়িয়ে পড়ে দেশের রাজনীতি, শিক্ষা, সাহিত্য সমাজ মাধ্যমগুলিতে। তৈরি হয় Federal Indian Law এর ভিত্তিতে তাদের সার্বভৌমত্ব ভূমি অধিকারের চুক্তি বা 'Treaty Rights' বিভিন্ন নেটিভ আমেরিকানদের মধ্যে নাভাহোরা দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজাতি (434,000 জন, 2021 সালে) এছাড়া নাভাহোরা সমগ্র USAতে সবথেকে বেশি পরিমাণ উপজাতি অধ্যুষিত জমির অধিকারী। তবে বৃহত্তর সমাজে নাভাহোরা আজ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। তার মধ্যে রয়েছে রিজার্ভেশন বা সংরক্ষণ নীতি যা তাদের খানিকটা অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। আর তাছাড়া রয়েছে নানা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা যেমন অপুষ্টি মাদকাসক্তি। বর্ণবিদ্বেষী বিভাজন একটি সামাজিক সমস্যা। 

নাভাহোদের পূর্বপুরুষরা ছিল যাযাবর শিকারি (nomadic hunter) শিকারের অন্বেষণে তারা ভ্রাম্যমান জীবন যাপন করতো। এভাবেই তারা Beringia অতিক্রম করে এশিয়া থেকে উত্তর আমেরিকায় (সাইবেরিয়া থেকে আলাস্কা) প্রবেশ করে প্রায় বারো হাজার পাঁচশো বছর আগে। অনুমান করা হয় যে তারা migrating animals বা পরিযায়ী পশুদের (যেমন ম্যামথ) অনুসরণ করেই এসেছিল। তুষার যুগ শেষ হলে গলিত বরফে বন্যার সৃষ্টি হয় বেরিনজিয়া ভূখণ্ড প্লাবিত হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় 'Bering Strait' এর ফলে মানুষ পশু উভয়েই উত্তর আমেরিকায় থেকে যায় কারণ ফিরে যাওয়ার কোন উপায় তখন তাদের ছিল না। পরে উত্তর আমেরিকায় তারা ক্রমশঃ প্রবেশ করতে থাকে।

এই ঐতিহাসিক অভিপ্রয়াণের স্বপক্ষে বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন DNA পরীক্ষা খুব জোরালোভাবেই নেটিভ আমেরিকানদের সাথে এশিয়ার যোগসূত্র প্রমাণিত করে। আমেরিকার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলিও (archaeological sites) এদের বহু পর্বের অভিপ্রয়াণ সমর্থন করে। এই palaeolithic  hunter-gatherer রা (শিকারি সংগ্রাহক) বা প্যালীয় ইন্ডিয়ানরা পরবর্তীকালে উত্তর আমেরিকা হয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় চলে যায়। আস্তে আস্তে 8000 AD নাগাদ এরা কৃষিকাজ পশুপালনে (ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া) অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তিত জীবিকা স্থানীয় Pueblo উপজাতি ষোড়শ শতাব্দীতে আগত স্প্যানিশ উপনিবেশকারীদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে আত্মস্থ করেছিল। পরবর্তীকালে এদের সঙ্গে বারবার সংঘর্ষেও তারা জড়িয়ে পড়ে।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজাতি নাভাহোদের আজ অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট সচ্ছল হলেও বা আধুনিকতার স্পর্শ যথেষ্ট পেলেও তাদের পূর্বপুরুষদের জীবনধারণ প্রক্রিয়া তারা সযত্নে ধরে রেখেছে। ভুলে যায়নি তাদের পুরাতন ধ্যান ধারণা, ধর্মীয় বিশ্বাস সংস্কৃতি। এর সঙ্গে পরিচয় করতে নিজেদের নানা ভাবনা চিন্তাধারায় সমৃদ্ধ হতে আজ অনেক ভ্রমণ সংস্কৃতি পিপাসু মানুষ এখানে আসছে এদের নানা প্রকৃতিবান্ধব জীবন প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।

নাভাহোদের ঐতিহাসিক পটভূমিকা, তাদের বর্তমান অবস্থান, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি জীবনযাত্রা বুঝতে সাহায্য করে। 2024 সালের অক্টোবর মাসে যখন USAর মনুমেন্ট (Monument) ভ্যালি যাই তখনও খুব ভালো ধারণা আমার তাদের সম্পর্কে ছিল না। ইতিহাসের প্রেক্ষিতে তাদের দেখে মনে হল আধুনিক সভ্যতা তাদের জীবনযাত্রা বেশ কিছুটা আধুনিকরণ করলেও শিকড় থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়নি। কিছুটা উল্টেপাল্টে নিয়ে প্রাচীনের সঙ্গে নূতনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তারা চমৎকার জীবন যাপন করছে। প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতি বা harmony  আজও তাদের জীবনে বহমান। এই প্রসঙ্গে একটি নাভাহো প্রার্থনার চিত্র দিলাম। এই প্রার্থনা কি তথাকথিত প্রগতিশীলতার বিরোধী!! এই মেলবন্ধনের প্রার্থনা তো সর্বজনীন। আজ যেখানে তার বিরোধ ঘটছে সেখানেই দেখা দিচ্ছে বিনাশ ধ্বংস যা প্রগতিশীলতার পরিপন্থী।



বালির ওপর বায়ু চলাচলের চিহ্ন 

                      

নতুন দেশ নতুন মানুষ দেখার উদগ্র উৎসাহে একদিন মনুমেন্ট ভ্যালি পৌঁছে গেলাম। ইউএসএ তে রকিজ পাহাড়ের পূর্বদিকে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ভ্যালি ট্যুর করতে বেরিয়েছি। Arches Valley পর সোজা মনুমেন্ট ভ্যালি। প্রায় আড়াই ঘন্টার লম্বা পথ। তবে ওখানকার চমৎকার মসৃণ রাস্তা যাত্রাপথের কোন কষ্টই অনুভব করতে দিচ্ছে না। সকালে বেরিয়ে ঘুরতে ঘুরতে প্রায় দুপুর নাগাদ দূর থেকে বিশালাকৃতির 'mesa' গুলো নজরে এলো। প্রথম দর্শনেই শিহরিত হলাম 'গায়ে আমার পুলক লাগে'....

রাস্তা চলে গেছে মনুমেন্ট ভ্যালির দিকে  

টেবিল আকৃতি  ও 'মিটেন্‌' বা দস্তানা আকৃতির মেসা  

খাওয়া সেরে বাইরে বেরিয়ে শুনলাম এখন মনুমেন্ট ভ্যালি ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য একজন স্থানীয় নাভাহো উপজাতির মহিলা এসেছেন। বেশ বড় একটা গাড়ি, বাসই বলা যায়, তিনিই ড্রাইভ করবেন এবং গাইড হিসেবে সবকিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন। এই পরিষেবা সাধারণতঃ ভ্রমণকারীদের জন্যই দেওয়া হয়। এটা নাভাহোদের আর্থিক সহায়তাও করে থাকে। 

এবার শুরু হল ভ্যালি পরিদর্শন। এতক্ষণের আসা রাস্তার মসৃণতা নিমেষেই উধাও। উঁচু-নীচু, এবড়ো খেবড়ো রাস্তা দিয়ে চলেছি। বাসের সর্বাঙ্গ প্রায় কেঁপে কেঁপে উঠছে আর তার ভিতরে আমরাও আমাদের শরীর অক্ষত রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত। এইসবের মধ্যে দিয়ে প্রাণপণ ছবি তোলার প্রায় অসম্ভব প্রয়াস করে চলেছি। ছবি কোথাও মোটামুটি ভালো আবার কোথাও বাসের কম্পমানতার শিকার। DSLR ক্যামেরার কয়েকটি কম্পমান overlapping ছবি একজনকে দেখাতেই বললেন - অসম্ভব রোমান্টিক হয়েছে!!  ফিরে যাওয়ার সময় এগিয়ে আসছে আর ইতিমধ্যেই অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ফেললাম। বেশ কয়েকটা পাঠ্যপুস্তকে দেখা ছবি চাক্ষুষ করে প্রভূত আনন্দ হল।

মেসা ও বিউটের দেশ

মনুমেন্ট ভ্যালিতে সন্ধ্যে নেমে আসছে

আমাদের মনুমেন্ট ভ্যালি ভ্রমণ ছিল প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক বিস্ময় সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় ভরপুর। মনুমেন্ট ভ্যালি নামটি এসেছে এর প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বিশালাকৃতি মনুমেন্ট গুলো থেকে। এই ভ্যালি কলরাডো প্লেটের একটি অংশ। দুর্গসদৃশ প্রাসাদোপম সমতল শীর্ষ মনুমেন্ট গুলো আসলে এই টেবিল ল্যান্ডেরই অত্যাশ্চর্য ভূমিরূপ। চতুর্দিকের ছড়িয়ে থাকা মেসা (mesa) এবং বিউট (butte) গুলো বিস্ময়কর। হাতের দস্তানার মত আকৃতি বিশিষ্ট দুটি মেসাকে East West  mitten বলা হয়। আবার কোনোটি বা নাভাহোদের বাসগৃহ 'Hogan' ( উচ্চারণহোঘান্‌’) এর মতো। মেসা শব্দটি এসেছে স্প্যানিশ শব্দ বা মূল ল্যাটিন শব্দ  'mensa' থেকে যার অর্থ টেবিল।  


মিটন্‌ বা দস্তানা আকৃতি

প্রত্যেকটি মেসাই একক সমতলশীর্ষ বিশিষ্ট। এদের ঢাল অত্যন্ত খাড়া। আর দেখতে অনেকটা পায়াবিহীন টেবিলের মতোই। এখানকার অতি শুষ্ক জলবায়ুতে শিলার কাঠিন্যের তারতম্য এই ভূমিরূপ সৃষ্টি করেছে। মেসার শীর্ষের শিলা তার তলদেশের শিলা অপেক্ষা কঠিন। সুতরাং ক্ষয়কার্য পারিপার্শ্বিক অপেক্ষাকৃত কোমলশিলা বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত করেছে তার তলদেশের কোমলশিলা রক্ষাও করেছে। কঠিন শিলা এখানে প্রধানতঃ স্যান্ডস্টোন্‌ বা বেলেপাথর কোমলশিলা চুনাপাথর বা লাইমস্টোন্‌  অন্যান্য শিলা দ্বারা গঠিত। স্তরায়নের মাধ্যমে পাললিক শিলা সহজেই চিহ্নিত করা যায়।  

  

অন্য আরেকটি মেসা


 মেসা 


মেসা 

মেসা বিউট মোটামুটি ভাবে এক হলেও বিউট মেসার তুলনায় খর্বাকৃতি। এদের আজকের বিচ্ছিন্নতা আকৃতি বহুবছরের বায়ু প্রবাহ, উত্তাপের তারতম্য, জলের স্রোত তুষারের প্রভাবে সৃষ্ট। এই প্রাকৃতিক শক্তিগুলিই এখানকার ভূমিরূপের ভাস্কর। সাধারণভাবে মেসাগুলির উচ্চতা ভ্যালি সমতল থেকে প্রায় হাজার ফুট। West Mitten মেসার উচ্চতা 6175 ফিট এবং East Mitten 6226 ফিট। Sentinel মেসার উচ্চতা 6450 ফিট।


Sentinel  মেসা 

জলবায়ু কিছুটা চরমভাবাপন্ন বলে গ্রীষ্মকালে দিনের বেলার উষ্ণতা প্রায় 380 সেলসিয়াস থাকে। শীতকালে দিনের বেলার উষ্ণতা এর তুলনায় কিছুটা কম এবং রাত্রিকালে -18° সেলসিয়াস বা তারও নিচে নেমে যায়। বাৎসরিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ 250 মিলিমিটার বা 10 ইঞ্চির কম। হালকা তুষারপাতও হয়ে থাকে।


John Ford Western  Movie র Scenic Point 

ভূতাত্ত্বিকভাবে মনুমেন্ট ভ্যালির পাললিক শিলা প্রায় 300 মিলিয়ন বছরের প্রাচীন। ক্রেটাসিয়াস্‌ যুগে স্তরে স্তরে চক্‌  চুনাপাথর সঞ্চিত হয়েছিল একটি নাতিগভীর অববাহিকা সমুদ্রের তলদেশে। (Creta মানে চকের সঞ্চয়) কালক্রমে এগুলি উত্থিত হয় 3 মিলিয়ন বছর ধরে জল, বায়ু তুষার দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। শিলার লাল্চে‌ রঙ এসেছে আয়রনের জারন্‌ বা oxidation এর জন্য এবং স্থানে স্থানে নীলচে ধূসর রঙ ম্যাঙ্গানিজ অক্সিডেশনের জন্য। 


নাভাহোরা এই আকৃতিতে পূর্ব পুরুষের আদল খুঁজে পায় 

অদ্ভুত এক ঈগল মূর্তি তৈরি  হয়েছে পাথরে 


পাথর ক্ষয়ে  জানালা তৈরি করেছে

ঘুরতে ঘুরতে একসময় বাস থেমে গেল নাভাহো মানুষদের গ্রামে। দেখলাম এমন রুক্ষ শুষ্ক প্রকৃতিকে কেমন ভাবে আপন করে নিয়েছে এই মানুষগুলো। যাযাবর জীবন থেকে স্থিতিশীল হয়েছে তারা। নতুন করে শেখা বেঁচে থাকার পথে জীবিকা কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। পশু শিকার থেকে শিখেছে কৃষিকাজ স্থানীয় পুয়েব্ল (Pueblo) উপজাতির মানুষের কাছে। প্রথম চাষ করতে শিখেছে 'Three Sisters' বা ভুট্টা, বিন্স স্কোয়াশ চাষ। খাদ্যাভাসেও এসেছে পরিবর্তন। কৃষিকাজ বা ভূমিকর্ষণ মানুষকে স্থায়ী বাসস্থান দেয়। ভূমির সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়ে ওঠে নিবিড়। আমাদের দেশেও যাযাবর আর্যরা স্থায়ীত্ব পেয়েছিল কৃষির মাধ্যমেই। ইউরোপীয়রা যখন পশ্চিমের দিকে পা বাড়িয়েছে তখন তারাও শুরু করে বাণিজ্যিক আদান-প্রদান। ক্রমশঃ ভেড়াই হয়ে দাঁড়াল তাদের বাণিজ্যিক মুদ্রা সামাজিক মর্যাদার সূচক। এছাড়া নাভাহোদের অনন্য বুনন শিল্পের উত্থান উৎকর্ষ প্রকাশ পেল তাদের বুনে তোলা কম্বল পোশাকে। শিল্পের এই উৎকৃষ্ট নমুনা পা রাখল বাণিজ্যের আঙিনায়। তাই তাঁত বোনে মেয়েরা। সৃষ্টি হয় জ্যামিতিক নকশার পশমের পোশাক অন্যান্য সামগ্রী।  


পশম রঙ করার Dye Chart

Vertical loom বা longitudinal loom বা দণ্ডায়মান তাঁত রয়েছে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে। মধ্য ষোড়শ শতাব্দীতে স্প্যানিশ তথ্য অনুযায়ী নাভাহোরা বিশাল পশুসম্পদের অধিকারী ছিল তাদের কৃষিজমিও ছিল বিস্তৃত। 1930 থেকে 1950 এর মধ্যে ফেডেরাল সরকার পশুসম্পদ হ্রাস করার নির্দেশ দেয় যাতে এই শুষ্ক অঞ্চলে সবুজ উদ্ভিদ হ্রাস না পায় ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি না পায়। সুতরাং পরিবার প্রতি পশুর সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হলো।


লম্বাটে তাঁত ও ভেড়ার লোম থেকে বোনা কম্বল ইত্যাদি

যে কোন উপজাতিদের মতোই নাভাহোদের ধর্মীয় আধ্যাত্মিক বিশ্বাস অত্যন্ত গভীর প্রকৃতির মধ্যেই নিহিত। পূর্বপুরুষদের থেকে শোনা কাহিনী (oral history) এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বয়ে চলে। মানুষকে তারা দুটি ধরনে বিভাজিত করেধরিত্রীর মানুষ (Earth people) পবিত্র মানুষ (Holy people) নাভাহোরা নিজেদের ধরিত্রীর মানুষ বলে মনে করে। সেই জন্য তারা ধরিত্রী মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়ত একটা ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করে যায়। এটা তাদের একটা অসাধারণ চিন্তন্‌। নাভাহোদের সম্পদ মাতৃতান্ত্রিক। মহিলারাই পশুসম্পদ, বাসগৃহ, চাষজমি পশুচরণ ভূমির অধিকারী। বিবাহের পর থেকে ছেলেরাই মেয়েদের বাড়িতে বাস করতে যায়। 


বেড়ানো শেষে নাভাহোদের গান শোনা 

নানা কাহিনী শুনতে শুনতে দিন ক্রমশঃ শেষ হয়ে এলো। মাটির লাল রঙ যেন আকাশ স্পর্শ করল। আর সেই আলো-অন্ধকারে চারিদিকের বিশাল পাথুরে মেসা বিউটগুলো কেমন যেন অতিপ্রাকৃতিক রূপ ধারণ করল।


হোঘানের আকৃতির ক্ষয়প্রাপ্ত শিলা

আমরা এবার ওদের কাছে বিদায় নিয়ে চললাম আমাদের রাত্রিযাপনের আস্তানায়। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তা। শুধু গাড়ির হেডলাইটের আলো লাল ধুলোর উপর পড়ছে আর দূরে কিছু আলোর ফুটকি, মনে হচ্ছে ওগুলো কোন বাড়ির আলো। এখানে স্ট্রিট লাইট বলে কিছু নেই। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আবছা বিশালাকৃতি সব মনুমেন্ট। কারো মুখে কোন কথা নেই। দূরে একটা কুকুরের ডাক ভেসে এলো। অবশেষে গুগল ম্যাপের সাহায্যে পৌঁছলাম গন্তব্যস্থলে।

এই হোঘানে রাত্রিবাস করলাম

এই পরিবেশে রাত্রিযাপনের অভিজ্ঞতা অসাধারণ বললেও কম। আমরা থাকবো নাভাহোদের একটা হোঘান। একটা বাড়ির একটাই গোলাকৃতি ঘর। এখানে কোন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ব্যাটারীতে আলোর ব্যবস্থা। এমনকি ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ। অর্থাৎ বাইরের জগত থেকে আমরা একেবারে বিচ্ছিন্ন, নিজেকে চেনার এক অনন্য সুযোগ। ঘরের বাইরে তখন অসংখ্য তারা ভরা আকাশ ছায়াপথ দৃশ্যমান। তার নিচে দাঁড়িয়ে মহাবিশ্বকে অনুভব করে - 'বিস্ময়ে তাই জাগে আমার প্রাণ' কিন্তু বেশিক্ষণ বিস্মিত থাকা গেল না। সূর্য ডুবতেই ঝপ করে তাপমাত্রা কমে গেছে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া এসে বিঁধছে। অতএব হোঘানের উষ্ণ আলিঙ্গনের আহ্বান উপেক্ষা করা গেল না।      

হোঘানের ভিতরে রাখা চুল্লী 

হোঘানের ছাদ ও চুল্লীর চিমনী 

ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা লোহার চুল্লী বসানো। ভিতর কাঠের টুকরো জ্বলছে। চুল্লীর চিমনি ঘরের ছাদের মাঝখান দিয়ে বাইরে গেছে। সেখানে একটা চৌকো ফ্রেম লোহার জাল দিয়ে ঢাকা। গোল ঘরের দেয়াল ঘেঁষে বিছানা, টেবিল, চেয়ার, কফি চায়ের সরঞ্জাম, পানীয় জলের ব্যবস্থা, কিছু বইয়ের সংগ্রহ, বাচ্চাদের জন্য খেলনা ইত্যাদি সাজানো। সব কিছুই আমাদের জন্য। খাটের মেঝেতে নাভাহো মেয়েদের তৈরি জ্যামিতিক নকশার কার্পেট পাতা। নাভাহোদের কোন নকশাই ফ্লোরাল নয়। এমনকি ভেড়ার লোমের কম্বলগুলোর নকশাও একই ধরনের। দেয়ালের গায়ে শুকনো ভুট্টার গোছা ঝুলছে। এখানকার ভুট্টা সাধারনত দু ধরনেরblue corn আর white corn এছাড়াও খাদ্য অন্যান্য অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে এরা কিছু নিজস্ব প্রথায় উৎপন্ন করা ভুট্টার চাষও করে থাকে। প্রতিটি জিনিস অত্যন্ত সুবিন্যস্ত ভাবে রাখা। 

হোঘানের ভিতরে শুকনো 'blue corn' ও 'white corn' ঝোলানো 

সবই ঠিক ছিল শুধু গোল ঘরের গোল বাধলো অন্য জায়গায়। নাভাহোদের রীতি অনুযায়ী পরিবারের সবাই একই ঘরে বাস করে। আমাদের রীতি তা নয়। তবে অনেক কিছুর সাথেই অভ্যস্ত হতে হয়, নতুন জায়গার নতুন রীতিনীতি অনুযায়ী। সবাই খুব ক্লান্ত ছিলাম। ঘুম আসতে দেরি হলো না।

'Blue corn' এর রুটি দিয়ে নাভাহো প্রাতরাশ


'Metal Tea-pot' এ চুল্লীর ওপর চা গরম হচ্ছে
 
সকালে প্রাতরাশ নিয়ে এলেন ঘরের কর্ত্রী রোজি। নানা প্রকার ফল, স্যালাড, মিষ্টি রুটি নানাবিধ পানীয় সহযোগে সুন্দর প্রাতরাশ সম্পন্ন হলো। তারপর আমাদের সঙ্গে নাভাহোদের নানা লৌকিক কাহিনী, রীতিনীতি, ইতিহাস নিয়ে গল্প করতে বসলেন। আমাদের নানা কৌতুহলও যথাসাধ্য মেটালেন। কথা বলতে বলতে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিলেন। সম্ভবতঃ অতীতের কোন স্মৃতি তাকে ভারাক্রান্ত করছিল। এখনকার কিছু সমস্যার কথাও বললেন। বর্তমান প্রজন্ম প্রাচীন ঐতিহ্যকে কতটা ধরে রাখবে সে ব্যাপারেও আশঙ্কা প্রকাশ করলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন কোণে বিভিন্ন উপজাতির মানুষরা আজ একই আশঙ্কায় আশঙ্কিত। বহুকাল ধরে প্রচলিত সমাজের ঐতিহ্য সংস্কৃতি আজ আধুনিক সভ্যতায় মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। খানিকটা জীবন জীবিকার প্রয়োজনেও। তাই কোথাও ওদের নিজস্বতা আর বজায় থাকছে না। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের আত্মসম্মান জাত্যাভিমান।  

হোঘানের ভিতরে রোজির কাছে নানান কাহিনী শোনা  

রোজি ও তাঁর পোষ্য স্যুসি

নাভাহোদের বাসগৃহ হোঘানের কতগুলো বৈশিষ্ট্য আছে। ঘরের মূল কাঠামো তৈরি হয় জুনিপার পাইন কাঠ দিয়ে। কাঠের বিন্যাসেই (log arrangement) ঘর তৈরি হয়। কোথাও পেরেক বা দড়ি ব্যবহার করা হয় না। কাঠামোর বিন্যাস অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত সুচিন্তিত। কাঠামো তৈরি হয়ে গেলে ঘরের তাপমাত্রা সঠিক রাখার জন্য প্রলেপ দেওয়া হয় লালমাটির কাদা (sandstone dust) দিয়ে।    

হোঘান্‌ দুই ধরনের হয় - Male Female প্রত্যেকটি হোঘানের একটিই পূর্বমুখী দরজা যাতে সূর্যের প্রথম আলোয় ঘর আলোকিত হয়। হোঘান্‌ দেখতে মূলতঃ গোলাকার হলেও আসলে এগুলি অষ্টকোণ (octagon) বিশিষ্ট। ছাদকে কল্পনা করা হয় আকাশের সাথে। আকাশ পৃথিবীকে তারা এইভাবে মেলানোর চেষ্টা করে। Male হোঘানের দরজা চৌকো আকৃতির। এগুলি সাধারণতঃ কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়। Female হোঘানগুলি তাদের বাসগৃহ। আকাশকে বলা হয় 'Father Sky' মাটিকে 'Mother Earth' এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য (balance) সঙ্গতি (harmony) রাখাই তাদের মূলমন্ত্র।  


এবার আমাদের যাত্রা শুরু হবে কলোরাডো নদীর বিখ্যাত horse shoe bend দেখতে। রোজি তাঁর পোষ্য কুকুর স্যুসিকে তাই বিদায় জানিয়ে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। 

 

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক 
ভূগোল বিভাগ 
উইমেন্স ক্রিস্টিয়ান কলেজ 
কলকাতা 

মন্তব্যসমূহ

  1. সমৃদ্ধ হলাম দিদি.. অনবদ্য উপস্থাপনা.. দারুণ সব ছবি.. আর দুর্দান্ত লেখনী.. খুব ভালো লাগলো 🙏🏻❤️

    উত্তরমুছুন
  2. Onek kichu janlam ma'am, koto kichu janar ache, dekha r ache.✨️

    উত্তরমুছুন
  3. WOW 😯 Soo Interesting..You have explored so many offbit places.. & still exploring..& becoming the inspiration of others🤠 Thanks 🙏🏻 for sharing your beautiful experience 💓👍🏻

    উত্তরমুছুন
  4. এক কথায় অসাধারণ। এই লেখাটি যে শুধু ভূগোল ও ইতিহাস এর যৌথ সমন্বয় তাই নয় বরং এই লেখাটির দ্বারা আমরা সাধারণ জ্ঞান লাভ ও করতে পারি। এই লেখা, ছবির দ্বারা আমরা অবস্থানে না থেকেও সেখানে থাকার মতো অনুভূতি প্রকাশ করে।

    উত্তরমুছুন

  5. ইতিহাস ভূগোল মিলেমিশে অসামান্য একটি লেখা।
    বিরাট আকাশের নীচে বিশালাকৃতির মেসা... বিউট – ভূমিরূপের বৈচিত্র্য! শিহরণ জাগে। এদের মধ্যে রয়েছে এই পৃথিবীর কত ভাঙা গড়ার কথা।

    এশিয়া থেকে একসময় ম্যামথদের অনুসরণ করে গিয়ে পৌঁছলেন আমেরিকায়!!! চোখের সামনে দেখছি যেন!

    আর্যরা ও এসেছিলেন একসময় আমাদের দেশে জল, খাদ্যের সন্ধানে।

    বারেবারে পড়বার মতো লেখাটি।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অন্যরকম পুজো

বাংলার মানচিত্রের বিবর্তন