করোনার গ্রাসে ক্যালির্ফোনিয়া ভালো নেই
২০/১০/২০২০
শিল্পী বিশ্বাস*
অনেকদিন পর আজ প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়ে সামনে এক ভদ্রমহিলা কে দেখতে পেয়ে স্বাভাবিক নিয়মে সুপ্রভাত বললাম। দেখলাম একটু তাকিয়ে নিরুত্তরে দূরে সরে গেলেন আর আমিও যেন এক অস্বভাবিক নিয়মে দূরত্ব বজায় রেখে চলে গেলাম।যেখানে সামনে উপস্হিত হলে একে অপরকে সানন্দে অভিবাদন করতাম, আজ যেন সেখানে সবাই হঠাৎ করে অপরাধ জগৎ এর চরিত্র হয়ে উঠেছি, মুখ ঢেকে সরে যাচ্ছি। একটি আনুবীক্ষনিক জীব কিভাবে নিমেষে আমাদের একাকী ও স্বার্থপর করে দিয়েছে। পৃথিবী ব্যাপী এখন একই চিত্র।
সুন্দর প্রকৃতি
আমি শিল্পী বিশ্বাস। স্বামীর কর্মসূএে এখন আমি প্রবাসী বাঙালী।যেখানে থাকি সেটি সূদুর আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেস এর পাহাড় ঘেরা ছোট্ট শহর উডল্যান্ড হিলস্। প্রায় চার বছর ধরে এই শহর আমাকে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মানুষের উন্মাদনা দিয়ে আঁকড়ে রেখেছে। চারিদিকে পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল ও তার সাথে সাথে এখানকার মানুষদের দুঃসাহসিক কর্মপ্রবনতা আমাকে বারবার এই শহরের প্রেমে ফেলে দেয়।
গাছ দিয়ে ঘেরা পাহাড় থেকে আমাদের শহর
এসে থেকেই দেখছি, শুক্রবার হলেই সারা সপ্তাহের কাজের পর এদের মধ্যে এক অন্যরকম উওেজনার সঞ্চার হয়।পুরো বদলে ফেলে তাদের কর্মজীবনের ব্যস্ততাকে, পরিবার, বন্ধু বান্ধবরা সহকর্মীদের নিয়ে রেঁস্তোরা, শপিং কমপ্লেক্স, সিনেমা হল বা পর্যটন স্থানগুলিতে দল বেঁধে আনন্দে মেতে উঠতে।কখনও বা দেখেছি পাহাড়ের ধারে গাড়ী দাঁড় করিয়ে দোলনা টাঙিয়ে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত ও চাঁদনীরাত উপভোগ করতে।আবার দেখেছি জঙ্গলে তাঁবু খাটিয়ে বা সমুদ্রের ধারে ছাতা টাঙিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভব করতে।সপ্তাহের শেষ মানেই তখন ছুটির আমেজ। আর তার পাশে হলিউডের হাতছানি তো আছেই।আর এই আনন্দ উওেজনা সব যেন হঠাৎ করে কেড়ে নিলো কোভিড-১৯।
New Normal এ সাবধানী
হঠাৎ করেই থমকে গেলো হলিউডের শহর লস অ্যাঞ্জেলেস্।যে শহরের আনাচে কানাচে মানুষ প্রান খুঁজে নিতো, আজ সেই শহরের রাস্তা প্রাণহীন। সমুদ্রের ধারে যেখানে গানের সুরে, নাচে, সমুদ্রের সাথেসাথে মানুষ নেচে উঠতো, সেখানে আজ সমুদ্রের গর্জন ছাড়া কিছুই শোনা যায় না। যে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, হর্স-সু-বেল্ট এর মতো ক্যানিয়নগুলো, ইয়োসোমাইট ন্যাশনাল পার্ক, রেডউড ন্যাশনাল পার্ক এর মতো স্হান গুলি পর্যটকের ভিড়ে জমজমাট ছিলো, সেই স্হানগুলি চেয়ে আছে মানুষের ছোঁয়ার অপেক্ষায়।
Pier
লাস ভেগাস, সানফ্রান্সিসকো এর মতো আলো ঝলমলে শহরগুলিতে যেখানে মানুষ, ভিড় ঠেলাঠেলিতেই আনন্দ খুঁজে পেতো, আজ সেই শহরগুলিতে আলো আছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের উন্মাদনা আর নেই। অর্থনীতির সাথে সাথে মানুষের মনোবল ও ভেঙে পড়েছে। প্রায় ছয় মাস হতে চললো এই প্রানবন্ত ক্যালিফোর্নিয়া, প্রাণ হারিয়ে অপেক্ষারত ভালোদিনের আশায়। স্কুল -কলেজ- অফিস-বাজার সবই প্রায় বন্ধ হয়ে বা কিছু মানুষ কাজ হারিয়ে সবাই এখন গৃহ বন্দী। এর মাঝে যখন সরকার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে সচল করবার চেষ্টা করছে, তখনই শুরু হলো আমেরিকা জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় “ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটারস“।চারিদিক তখন হাজার হাজার মানুষের ভিড়-লুটপাট চলছে; আগুন জ্বলছে।
সমুদ্র উপকূল
একদিকে ক্যালিফোর্নিয়া জুড়ে প্রতিবাদের আগুন, অন্যদিকে জঙ্গলের পর জঙ্গল রুক্ষ আবহাওয়ায় পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।আর এর মধ্যেই কমে চলেছে হসপিটাল এর বেড আর বেড়ে চলেছে কোভিড-১৯ এর আক্রান্তের হার।কিন্তু এই ছয় মাসে যেটা উপলব্ধি করেছি, সেটি হলো মানুষের স্বভাবগত চরিএ সব স্থানেই এক। দেশে হোক বা বিদেশে মাস্ক পরা ও ঘরে বন্দী জীবন কাটানো নিয়ে সবার আপওি। সরকারী নির্দেশিকা না মানলে ক্ষতিপূরণ এর ভয় দেখিয়ে মাস্ক পরাতে হচ্ছে।
পাইকারী বাজারগুলো ও রেঁস্তোরাগুলো দেখলে মনে হয় সারা সপ্তাহ সবাই ক্ষুধার্ত থাকে। কবে সব ঠিক হয়ে প্রানহীন শহর প্রান ফিরে পাবে জানিনা, তবে প্রকৃতি এই দূষনময় জীবন থেকে আরও সুন্দরতর হয়ে উঠেছে। আর এই দীর্ঘ সময় ধরে ঘরে থাকতে থাকতে মানুষ এখন ঘরেরবাইরে পা রাখতে শুরু করেছে, পরিবারের সাথে দেখা করার জন্য আকুল হয়ে উঠেছে। আসতে আসতে স্কুল, কলেজ, অফিস, বাজার আনুষাঙ্গিক সব কিছুই খুলে যাচ্ছে ও যাবে, কিন্তু সঙ্গী থাকবে এই কোভিড১৯, মাস্ক ও স্যানিটাইজার। আর তার মধ্যেই এই সুন্দর প্রকৃতির মাঝে খুঁজে নিতে হবে বেঁচে থাকার ইচ্ছা। আর হয়তো এই বেঁচে থাকার ইচ্ছাতেই, মানুষের মধ্যে বর্তমানে কিছু শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে। এখন মানুষজন আগের থেকে অনেক বেশী মাক্স ব্যবহার করছে, সামাজিক দূরত্ব ও সচেতনা অবলম্বন করে চলার চেষ্টা করছে। চেষ্টা করছে এই মহামারীকে যদি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। আশা করি ,শীঘ্রই আমরা আগের মতো সুস্হ জীবনে ফিরে যেতে পারবো।
*ছাত্রী, ২০০৯






ভালো লাগল লেখা।
উত্তরমুছুনপ্রকৃতির সৌন্দর্য, রুদ্র রোষ এবং বর্তমান পরিস্থিতির কথা খুব সুন্দর ভাবে লেখায় ফুটে উঠেছে।
উত্তরমুছুনShilpi tomar naam er jothartho ta tomar lekha o chhobi te pelam..aar sei sange anek khabor o ek ananyo upolobdhi.. manush muuloto ek i..
উত্তরমুছুন