ঝড়ের মাতন, মুখোশ ও লকডাউনে কলকাতা

২০/১০/২০২০

প্রমীলা  ভট্টাচার্য*

।।১।।


রূপ তোমার কখন দেখিনি

তাই তো পারিনি চিনতে

তুমি যে এমন ভয়াল, ভীষণ

আগে  তো পারিনি জানতে !

কতক্ষণই বা ছিলে বাংলায়

ঘণ্টা কয়েক হবে----!

দশদিক তুমি ভরে তুলেছিলে 

উন্মাদ  কলরবে----

কণ্ঠে তোমার  রণহুঙ্কার

মুখে ভ্রূকুটির  রেখা

চোখের  তারায় নাচে বিদ্যুৎ

মহাকাল  দিলে  দেখা!

মেঘগর্জনে ঘোষণা করলে

এবার  প্রলয়  শুরু--- অজানা শংকা বাজায় ডংকা

বুক কাঁপে  দুরুদুরু

ভেঙে তছনছ সাজানো বাগান

সাধনার  ফুলবন

আলো নিভে গেল গেল সব গেল--------,

হাহাকার  করে  মন

ধরাশায়ী যত বৃক্ষরাজেরা

পথের বনস্পতি 

ধূলিশয্যায় শুয়ে  আছে যেন

শত শত মহারথী !

সাগর আজকে হলো অশান্ত

প্রবল  জলোচ্ছ্বাসে

সেও দেখি যেন তোমার মতই

নিষ্ঠুর  হাসি  হাসে----

নদী ফুঁসে ওঠে ঢেউয়ে ঢেউয়ে  ছোটে----

ভেঙে  যায়  কত   বাঁধ

খেতের ফসল ডুবাইলে  জলে

কী  ভীষণ  অপরাধ !

কত তাজা প্রাণ দলে গেলে তুমি-------

নৃত্যের  তালে   তালে

তৃষ্ণা তোমার মিটেছে কি বল

মানুষের  আঁখিজলে?

তাদের মাথার ছাদ কেড়ে নিলে ,পায়ের তলার মাটি 

তোমার আঘাতে ভেঙে চুরমার  সংসার পরিপাটি

ভাঙে যারা শুধু গড়তে জানেনা,পায়না তো সম্মান

তোমার প্রাপ্য শুধু ধিক্কার

উম্ফান! উম্ফান!!...


।।২।।


ছোটবেলায়  মেলায় , খেলায় 

মুখোশ ছিল বড়ই প্রিয় 

বলত মিঠু  " বাপি আমায় 

একটা  মুখোশ কিনে দিও "।

বড়  হয়ে ঠিক বুঝেছি 

মুখোশের  এক অন্য মানে---

উপকারের  ছল করে সে 

দেয় যে ঠেলে বিপদ পানে ।কত ক্ষতি  করে মানুষ 

মুখোশেরই  আড়াল থেকে 

মুখোশ  পরেই  শয়তান তার 

আসল  স্বরূপ রাখে ঢেকে ।

এমন করেই  বিশ্বজীবন 

বইছিল তার আপন খাতে---

হঠাৎ  কখন কোভিড  এসে 

দারুণ  মারণ খেলায় মাতে । 

এক লহমায় ছন্দপতন 

চলার গতি থেমে গেল  ,

মুখোশধারী  জীবন যেন 

ছৌ-নাচেরই আসর হল!

কোভিড-রণে জিততে হলে 

সকল সময় সকল স্থানে 

মুখোশ ছাড়া নেই তো উপায় 

টিঁকে  থাকার এই জীবনে ।

প্রিয়তমার   মুখটি ঢাকা ,

প্রেমিক  বলে হতাশ সুরে 

" তার  মুখেতে  চাঁদের আলো 

দেখব  আমি কেমন করে " ?

শিশুর  মুখের  মিষ্টি হাসি 

তাও তো  উধাও  অন্তরালে--

কবির মনের তিলোত্তমা 

ফিরবে কি আর কোনো কালে

যাও ভুলে  যাও  সেসব দিনের 

শখ ,  সুখ আর  শৌখিনতা--

বাঁচো-বাঁচাও , নাও মেনে নাও 

মুখোশরাজের  অধীনতা  ।

অবাক  হয়ে  ভাবছি শুধু  ,

আরো  কত  কী দেখতে হবে! 

মুখ-মুখোশের  নিত্য  মিলন

নতুন  কালের  বার্তা  দেবে----

মাস্ক  মাস্ট-------- মাস্ক  মাস্ট


।।৩।।


প্রাণের  শহর  কলকাতা 

সাধের  শহর  কলকাতা 

আ  মরে  যাই  বাছা রে--

মুখ   শুষ্ক ,  চক্ষু   সজল

এমন  দশা  করল  কে  বল  ?

ঘর  নয়তো   এ  যেন  তোর 

বন্দিশালার   খাঁচা  রে  ।

মারণব্যাধি  মৃত্যুদূতী

ধ্বংস লীলায়  উঠল  মাতি

বসুন্ধরা   বলছে  কাঁদি

বাঁচা  আমায়   বাঁচা  রে  ।

তাইতো   মুখর   কলকাতা 

হারিয়েছে   সব   কথকতা 

নিত্য  চলা   গেছে   থেমে

স্তব্ধ   দামাল   কলকাতা  ।

জনশূন্য   রাস্তাঘাট --

রাসবিহারী   গড়িয়াহাট

পথচারী  আর  হয়না  নাকাল

ভিড়ের  ধকল   এড়াতে  ।

কোথায়   সরব  শ্যামবাজার 

কলেজস্ট্রিটের   বইবাজার ?

হাতিবাগানে  হাতিরা  আজ  

পারবে  ঘুরে   বেড়াতে ।

খেলার   শহর   কলকাতা 

মেলার   শহর   কলকাতা 

গানের   শহর  ,  চা-কচুরির

উষ্ণ  শহর   কলকাতা---।

ভোজবিলাসী   কলকাতা  

মিষ্টিশহর  কলকাতা  

গাঙ্গুরাম , বান্ছারাম , বলরামের   কলকাতা  ! 

কোথায়  গেল  সে রূপ  তোমার

থামল  কেন  জীবন-জোয়ার

বন্ধ   কেন  সকল   দুয়ার 

হায়   আমাদের   কলকাতা  ! 

আর   তোমাকে   বকবনা 

মন্দ   চোখে   দেখবনা--

যানজট   আর  মিছিল,মিটিং

লেকের  ধারে  যুগল  সিটিং

সব  নিয়ে তুই  আগের  রূপে

আয়রে   ফিরে   কলকাতা  ।

আমরা   আবার  তাকিয়ে  দেখি ---

স্বপ্ন  তো  নয় , সত্যি  একি

বাস-ট্যাক্সি -মেট্রো  নিয়ে 

ছুটছে  শহর  কলকাতা 

প্রাণের শহর কলকাতা 

সাধের  শহর  কলকাতা 

আমার  প্রিয়,  তোমার  প্রিয় 

সবার   প্রিয়   কলকাতা  ।।


*প্রাক্তন আধ্যাপিকা, উইমেন'স খ্রিষ্টান কলেজ

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অন্যরকম পুজো

নাভাহো (Navajo) উপজাতির সেকাল ও একাল - একটি ভৌগোলিক পর্যবেক্ষণ

বাংলার মানচিত্রের বিবর্তন