অতি – আতঙ্ক
সেই স্কুল জীবন থেকে ভূগোল পড়াকালীন মহামারী , অতিমারী প্রভৃতি শব্দগুলির সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। প্লেগ, ডাইরিয়া প্রভৃতি মহামারীর কথা শুধু ইতিহাসে পড়েছি, ভাবিনি কখনো নিজেও একটির সামনাসামনি হব। আমরা ভারতীয়রা বড়ই আশাবাদী। যখন বিগত বছরের গোড়ায় চীনে এক অতিমারী দেখা দিল এবং লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হচ্ছিল তখনও আমরা দূরত্বের বাহানা দিয়ে বড়দিনের কেক উপভোগ করছিলাম। ইতালিতে যখন গ্রামের পর গ্রাম শূন্য হয়ে যাচ্ছিল তখন আমরা সোশাল মিডিয়া তে ‘RIP’ লিখে দুঃখ প্রকাশ করছিলাম। কিন্তু তখনও আমরা আন্তর্জাতিক সীমারেখার মাধ্যমে ‘করোনা’ নামক এই অতিমারী কে বেঁধে রাখতে চেয়েছিলাম আমাদের থেকে অনেক দূরে। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই দূরত্ব পেরিয়ে আমাদের রাজধানীতে দেখা দিলো সেই আতঙ্ক। তখনও আমরা আশাবাদী ছিলাম যে ভারতে লকডাউন বা গৃহবন্দি ব্যাবস্থা চালু করে এই ‘কোভিড ১৯’ ভাইরাস সংক্রমণ কে আটকানো যাবে। কিন্তু সবই বৃথা হয়ে গেল। এপ্রিল মাসের গোড়া থেকে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করল আক্রান্তের হার, সাথে মৃত্যুরও। দেশের সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মী তাঁদের জীবন বিপন্ন করে আক্রান্তের প্রাণ বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে শুরু করলেন। অনেক স্বাস্থ্য কর্মী নিজেদের প্রাণ হারালেন। ধীরে ধীরে আক্রান্তের সংখ্যা এক দুই তিন করে পঞ্চাশ লাখ ছাড়িয়ে গেল। মৃতের সংখ্যাও প্রায় লক্ষাধিক ছাড়াল। তখনও বেশির ভাগ শহরবাসী মাস্ক ও সানিটাইজারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারেননি। তখনও তাঁদের আশাবাদী মন ভাবতেই পারেনি, অতিমারীর কবলে তাঁরা পড়তে পারেন। ঠিক এমনই এক সুত্র ধরে আমি এবং আমার বাড়ির সবাই এই আতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে পড়লাম।
জুলাই মাসের শেষের দিকে একদিন জানতে পারলাম বাবার অফিসে একজনের কোভিড -১৯ পজিটিভ এবং অন্য দশ জন জ্বরে ভুগছেন এবং প্রত্যেকেরই করোনার প্রতিটি উপসর্গ গলা ব্যাথা, কাশি, জ্বর ও দুর্বলতা বেশ প্রকট। আমরা ভীত হয়ে বাবা কে আর অফিসে যেতে দিলাম না। তবু শেষ রক্ষা হল না। সেই রাত থেকেই বাবার হালকা গলা ব্যাথা আর কাশি শুরু হল। আমরা প্রয়োজনীয় সব নিয়ম নীতি মেনে বাবাকে আলাদা ঘরে রাখলাম এবং প্রয়োজনীয় সব তত্ত্বাবধান দূর থেকে করছিলাম। মায়ের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা সব থেকে বেশি ছিল, হলও তাই। দু দিনের মধ্যে মায়েরও জ্বর, হালকা কাশি, তারপর এক এক করে বাড়ির সবার গলা ব্যাথা, জ্বর, কাশি শুরু হল। এই অতিমারীর লক্ষণগুলি যেমন সোশাল মিডিয়া এবং সংবাদ মাধ্যমের জন্য প্রতিটি মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিলো তেমনই পরিচিত হয়ে উঠেছিলো মৃত্যু ভয়। তাই করোনা সঙ্গে লড়াইটা শুধুমাত্র শারীরিক কষ্ট ভোগ করা নয়, সাথে মানসিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের বাড়ির সবার যখন জ্বর হল তখনই আমরা সবাই নিজেদেরকে ঘরে বন্দি করে নিয়েছিলাম। বাড়ির গৃহস্থালির কাজে নিযুক্ত মেয়েদের ছুটি দিয়েছিলাম। তবে আমাদের এই সচেতনতা এবং সাবধানতাই একটি সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাড়ার মানুষদের কাছে আমাদের বাড়ির সবার জ্বরের খবর পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের করোনাই হয়েছে সবাই ধরেই নিয়েছিল এবং পাড়ার বাকি মানুষদের কাছে খবর পৌঁছে দিতে একটুও দেরি করেনি। ফলে যাদের সাথে অনেক বছর কোন যোগাযোগ ছিল না তারাও সেই সময় আমাদের অবস্থা নিয়ে ভাবিত হয়ে পরে। তবে বলে রাখা উচিৎ যখন আমরা সবাই অসুস্থ এবং পুরোপুরি গৃহবন্দি সেই সময় হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ আমাদের প্রতিনিয়ত ওষুধ, বাজার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে সাহায্য করেছেন। অনেক আত্মীয় ও পরিজন এই সময় সাহায্য করার বদলে ক্রমাগত সমস্যা তৈরি করেছেন। স্থানীয় প্রশাসন থেকেও আশ্বাস দেওয়া ছাড়া কিছুই করা হয়নি।
বাবার টানা সতেরোদিন জ্বর ছিল, আমার জ্বর পাঁচ দিন ১০২ এর নীচে একবারের জন্য নামেনি। পরিচিত একজন চিকিৎসক আমাদের বাড়িতে এসে আমাদের নিয়মিত চিকিৎসা করেছেন। আমরা সতিই এই কঠিন সময় তাঁর নির্ভীকতার জন্য কৃতজ্ঞ। এছাড়া বাড়ির অন্যরা যেমন মা, ঠাকুমা, দাদু এবং কাকা সবাই কম বেশি অসুস্থতার মধ্যে দিয়ে ১৫ দিন কাটিয়েছিলেন। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি এই সব মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা ছাড়াও আর একটি প্রধান সমস্যা হল সামাজিক যন্ত্রণা। যাঁরা ভেবে নিয়েছেন তাঁর করোনা হয়েছে এবং তাঁর থেকে তাঁর বাড়ির অন্যদের সংক্রমণ হতে পারে তাঁদের যন্ত্রণার কথা অন্যদের উপলব্ধি করা অসম্ভব। আবার অন্যদিকে যাঁদের করোনা হয় তাঁদের পরিজনদের তাঁকে হারনোর ভয়টা হয় অত্যন্ত সাংঘাতিক। এই নিষ্ঠুর আতঙ্ক নিজের কাছের মানুষকে এক ঘরে করতে শিখিয়েছে। আবার চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেখেছে। অনেকেই তাঁর প্রিয়জনদেরকে শেষ দেখাও দেখতে পারেননি। এক কথায় মানুষের জীবন যে কতটা ঠুনকো এবং মানুষের শত উন্নতি সত্ত্বেও মৃত্যুর কাছে কতটা নিরুপায় সেটা বার বার বুঝিয়ে দিয়েছে।

Tomar abhiggota bhoyanok..kato manoshik udbeg o jantrona r modhye diye gechho..aantorik samobedona janai..
উত্তরমুছুনAamra jeno tomar abhiggota theke kichhu shikhte paari..
Lekha r sange graphics ti anobodyo
উত্তরমুছুন