সাঁওতাল আদিবাসীর জীবনযাত্রা
২১/১২/২০১৮
কবিতা মুর্মূ*
বাঁকুড়া জেলার ছাতনা ব্লকের শুশুনিয়া গ্রাম
পঞ্চায়েতের অন্তর্গত গিধুড়িয়া গ্রাম। এই গ্রামে প্রায় ৫০০ জন মানুষ বসবাস করেন। এই
গ্রামের মানুষ সবাই আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। আমি এই গ্রামের
আদিবাসী সন্তান।
গ্রামটির পূর্বদিকে একটি নদী বয়ে চলেছে, নাম
ধনকড়া, যা গন্ধেশ্বরী নদীতে মিলিত হয়েছে। এই নদী বর্ষার জলে পুষ্ট। বর্ষাকালে নদীর
দুই তীরবর্তী এলাকা জুড়ে নদীর জল প্রচন্ড গতিবেগে সশব্দে প্রবাহিত হয়। কিন্তু
গ্রীষ্মকালে নদীতে একফোঁটা জল থাকে না। ফলে এলাকায় জলাভাব দেখা যায়। নদী, পুকুর,
খাল, বিল সব শুকিয়ে যায়। তখন জলের জন্য আমাদের একমাত্র টিউবওয়েলই ভরসা।
এই গ্রামের পশ্চিমে শুশুনিয়া পাহাড়। এই পাহাড়
থেকে স্থানীয় মানুষ ফল, মূল, কাঠ ইত্যাদি সংগ্রহ করে থাকে। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ
বসতি স্থাপন করেছে কোন নদীকে কেন্দ্র করে বা বনভূমিকে কেন্দ্র করে। সেই সূত্র ধরেই
এই গ্রামে বসতি স্থাপন করেছে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ। বনভূমিকে আপন করে
জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছে। এই পাহাড় শাল, সেগুন, মহুয়া, বট, অশ্বত্থ,
শিরীষ, অর্জুন, পলাশ ইত্যাদি বহুমূল্য গাছে সমৃদ্ধ যার কাঠ সংগ্রহ পূর্বক বিক্রী
করে মানুষ অর্থ উপার্জন করে। শালপাতা, কেন্দুপাতা, ছত্রাক ইত্যাদি সংগ্রহ ও
বিক্রয়ের দ্বারাও বেশ কিছু মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়ে থাকে।
![]() |
| বিকেলের পড়ন্ত আলোয় শুশুনিয়া |
সাঁওতালিদের আদি পেশা হল শিকার ও সংগ্রহ। তীরধনুক,
বর্শা, বল্লম, কাস্তে ইত্যাদি অস্ত্রের মাধ্যমে বন্য শূকর, খরগোশ, কাঠবিড়ালি,
ইঁদুর, বাদুড় ও নানা রকমের পাখি শিকার করে থাকে। সাঁওতাল আদিবাসীরা আজও বছরের
বিভিন্ন সময়ে শিকার আভিযান কার্য চালায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বাৎসরিক ‘আযধিয়া
বুরু সেঁদরা’। এই শিকার অভিযান বৈশাখ মাসে অনুষ্ঠিত হয়। এই
শিকার অভিযানে পুরুষদেরকে অবশ্যই যেতে হয়। সাঁওতাল সমাজের পুরুষরা এই শিকার
অভিযানে না যেতে পারলে পুরুষ জন্ম নিরর্থক বলে মনে করেন। অভিযানে প্রাপ্ত শিকার
নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ হয়ে থাকে। শিকারের প্রাণীবিদ্ধকারী ব্যক্তি অবশ্য
একটু বেশি পেয়ে থাকেন। আদিবাসী সম্প্রদায় প্রধানতঃ নদী, কৃত্রিম পুকুর
এবং জলাধার থেকে মৎস্য শিকার করে থাকে। ফাঁদের সাহায্যে বা জালের ব্যবহা্রের
মাধ্যমেও মৎস্য শিকার করে থাকে।
![]() |
| চাষের জমি |
সাঁওতাল আদিবাসীদের প্রধান জীবিকা হল কৃষিকাজ। আমরা
আষাঢ় শ্রাবণ মাসে রোপণ পদ্ধতিতে ধান চাষ করে থাকি। শীতের শুরুতে অর্থাৎ অগ্রহায়ণ
মাসে পাকা ধান কাস্তে দিয়ে কেটে ফেলা হয়। পূর্বে ধান থেকে চাল তৈরির কাজে ঢেঁকি,
হামাল দিস্তা, কুলো প্রভৃতি ব্যবহার করা হত। বর্তমানে আর ঢেঁকি চাল তৈরি হয় না।
আধুনিক পদ্ধতিতে ধানকলের সাহায্যে ধান থেকে চাল তৈরি করা হয়।
এই গ্রামের মানুষেরা পশুপালন করেও জীবিকা
নির্বাহ করে থাকে। গৃহপালিত পশুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল গরু, মোষ, শূকর, ভেড়া,
ছাগল, মুর্গি প্রভৃতি। গরু, মোষ কৃষিকাজে লাঙল টানার কাজে ব্যবহার করা হয়। হাঁস, মুর্গি, শূকর, ভেড়া আমরা ভক্ষণ করে থাকি। আমরা নানারকমের
শাক এবং তরিতরকারি দিয়ে তিন বেলা ভাত খাই।
গ্রামে প্রবেশ করার মুখেই আছে ‘জাহের থান’ এবং
অপর প্রান্তে আছে অশ্বত্থ গাছ। গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে ‘মাঝি থান’ আছে। এটা সাঁওতাল
আদিবাসী গ্রামে প্রধান বৈশিষ্ট্য। জাহের থানে এ সাঁওতালদের সৃষ্টি কর্তা বা প্রধান
দেবতা ‘লিটা গোঁসাই’, ‘মারাং বুরু’ এবং প্রধান দেবী ‘জাহের আয়ো’ অবস্থান করেন।
সমগ্র সাঁওতাল উপজাতি সর্বমোট বারোটি গোত্রে
বিভক্ত। প্রতিটি গোত্রেরই গোত্র দেবতা রয়েছে। ছেলে মেয়েরা বাবার গোত্র পেয়ে থাকে
অর্থাৎ গোত্রগুলি পিতৃকেন্দ্রিক। বারোটি গোত্র হল ১. হাঁসদা, ২. হেম্ব্রম, ৩.
মুর্মু, ৪. কিস্কু, ৫. বাস্কে, ৬. টুডু, ৭. মান্ডি, ৮. সরেন, ৯. বেস্রা, ১০.
পাউরিয়া, ১১. চঁড়ে ও ১২.বেদিয়া। সাঁওতাল সমাজে পরিবার রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনে
মেয়েরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। বিবাহকে আমাদের ভাষায়
‘বাপলা’ বলা হয়। পরিণত বয়সে ছেলেমেয়ের বিবাহ দেওয়াই রীতি। সাঁওতাল আদিবাসীদের একই গোত্রের মধ্যে কখনই বিবাহ হয় না।
পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পিতাই সমস্ত বিষয় সম্পত্তির মালিক। পিতা মারা গেলে পুত্রের
মধ্যে মালিকানা সঞ্চারিত হয়ে থাকে। পুত্রেরা পিতার সম্পত্তির সমান অংশ পেয়ে থাকে।
একমাত্র পুত্র সন্তান না থাকলেই পিতার সম্পত্তিতে কন্যা সন্তানের অধিকার জন্মায়।
![]() |
| আদিবাসী পরিবার |
সাঁওতাল আদিবাসী সমাজে সামাজিক ও ধর্মীয়
নিয়মকানুন অত্যন্ত আন্তরিকতা ও কঠোরতার সাথে পালিত হয়। গ্রামের অনুশাসন পঞ্চায়েতের
মাধ্যমে পরিচালিত হয়। গ্রামের পরিচালিত কার্য নির্বাহক সমিতির মধ্যস্থিত ব্যক্তিদের
সংখ্যা হল পাঁচ। এরা হলেন ১. মাঝি বাবা (গ্রামের প্রধান), ২.
পারানি, ৩. যোগমাঝি, ৪. নায়কে (গ্রামের পুরোহিত) ও ৫. গডেৎ (গ্রামের বার্তাবাহক)। সাঁওতালদের
সমাজে দশ বারোটি গ্রাম নিয়ে তৈরি হয় একটি বিরাট সংগঠন। যার নাম পরগণা।
সমগ্র সাঁওতাল জাতির ও গ্রাম গুলির ঐক্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখতে পরগণা
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।
আমাদের প্রধান দেবতার নাম হল ‘মারাং বুরু’, ‘মড়েকোতুরই’,
‘জাহের এরা’ ইত্যাদি। সাঁওতাল আদিবাসীদের জীবনে সবচেয়ে বড় উৎসব হল ‘বাহা পরব’ এবং ‘সহরায়
পরব’। বাহা উৎসবের ওপর সহরায় উৎসব নির্ভরশীল। বাহা উৎসব হলে তবেই সহরায় উৎসব
অনুষ্ঠিত হবে। ফাল্গুন মাসে বনে জঙ্গলে নতুন ফুলের সমাহারকে অভিনন্দন জানানোর
উদ্দেশ্যে বাহা পরব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই উৎসব অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত গাছের
নতুন পাতা, ফুল বাড়িতে আনা নিষিদ্ধ।
পৌষ মাসে সহরায় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসব ৪-৫
দিন হয়ে থাকে। এই সময় ঘর বাড়ি সুন্দর ভাবে সাজানো হয়। বাড়ির দেওয়ালের উপর হাল্কা
করে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। নানা রকমের পশু, পাখি, ফুল ইত্যাদির চিত্র অঙ্কন করা
হয় দেওয়ালে। পুরুষেরা শিকার অভিযানে যায় এবং মেয়েরা নানা ধরনের পিঠে তৈরি করে।
দ্বিতীয় দিন থেকে নাচ গানের অনুষ্ঠান শুরু হয়। মেয়েরা শাড়ী গহনা পরে, মাথায় খোঁপায়
ফুল লাগিয়ে সুন্দর করে সাজগোজ করে; দল বেঁধে হাতে হাত ধরে মাদলের তালে নাচে। পুরুষরা কৌপিন জাতীয় কাপড় কোমরে বেঁধে রাখে, পায়ে নূপুর পরে, হাতে আংটি, বাজু,
গলায় মালা ইত্যাদি অলংকার পরে থাকে।
মাঘসীম, ছাতা পরব, পাতা পরব, করম পরব ইত্যাদি আমাদের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পরব।
বর্তমানে সাঁওতাল আদিবাসীরা লেখাপড়া শিখে
সমাজের মূল স্রোতে প্রবেশ করেছে আনেকাংশে কিন্তু তবুও আমরা আমাদের সাতন্ত্র্য বজায়
রাখতে বদ্ধপরিকর। সমাজ ও সংস্কৃতির স্বকীয়তা বজায় রেখে আমরা এক জাতি, এক প্রাণ;
এরই নাম ভারতবর্ষ। জয় হিন্দ্।
*দ্বিতীয়
বর্ষ, ২০১৮



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন