অজানা অচেনা সালবর্ডী
২১/১২/২০১৮
মৌসুমী ব্যানার্জী*
স্বামীর বদলির চাকরির সুবাদে ভিন রাজ্যে আমার প্রবাস
জীবন।নানা অঞ্চলের নানা রঙ, রূপ, মানুষজন, ভাষা, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ প্রবাস জীবনের এক বিশেষ পাওনা। তখন আমার প্রবাস জীবন কাটছিল নাগপুরে। নাগপুর মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ অঞ্চলের শহর। ভারতবর্ষের মাঝখানে এর অবস্থান। কমলালেবুর জন্য খ্যাতিও আছে। সুন্দর , পরিচ্ছন্ন, ছিমছামশহর।
সাতপুরা পর্বতের দক্ষিণ ঢালের মালভূমিতে
অবস্থানের জন্য শহরের মধ্যেই বা একটু বাইরে গেলেই টিলা বা পাহাড়ের দেখা পাওয়া যায়। সেইজন্যই বর্ষা বা শীতের সপ্তাহান্তের একটি ছুটির দিনই বেশ
সহজেই পাহাড়, নদী বা জঙ্গলের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। এমনই একটি ছুটির দিনের গন্তব্য হল ১৩৫ কিমি দূরে কম পরিচিত একটি গ্ৰাম ‘সালবর্ডী’। মহারাষ্ট্রের অমরাবতী ও মধ্যপ্রদেশের বেতুল জেলার
প্রান্তে এই গ্ৰামটি। মার্চ মাসের সকাল বেলা। যাওয়ার পথটিও ভারী চমৎকার। কালো পিচের রাস্তার দু ধারে
সেগুনের জঙ্গল, থেকে থেকেই ছোট, মাঝারি টিলা, বেশ কয়েকটি নাম না জানা ছোটখাট নদী আমাদের যাত্রাপথের সঙ্গী হল। মাথার উপর উন্মুক্ত নীল আকাশ। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে পথের দুপাশের লাল আগুন রঙা পলাশ ফুল যাত্রাপথের আনন্দে
অন্যমাত্রা যোগ করল।
![]() |
| সাতপুরা শ্রেণী |
দুঘন্টার কিছু কম সময়ের মধ্যেই পৌঁছলাম সালবর্ডী। সাতপুরার দক্ষিন ঢালের পাদদেশের এই স্থানটি এক নজরে ছবির
মতো। সামনেই পাহাড়ের সারি। সবুজ গাছপালায় ঘেরা চারপাশ। সেগুন, মহুয়া, নিম, পলাশ , বেল ইত্যাদি নিয়ে এখানকার সবুজের সম্ভার। একপাশ দিয়ে বয়ে চলছে মালু নদী (Malu/ Maru)। বিশাল বিশাল আকারের পাথর তার পথের দু ধারের সঙ্গী। স্বচ্ছ, কাচের মত জলে পাহাড়, পাথর, গাছপালার প্রতিবিম্ব। দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল ভূ- তাত্ত্বিক ইতিহাসের কত মূল্যবান
ঘটনার সাক্ষী এই পাথরগুলি ! কদিন আগেই শোনা গিয়েছিল এই অঞ্চলেরই কোনোও এক জায়গায় পাওয়া গিয়েছে ডায়নোসরের
জীবাশ্ম। কোনোও এক প্রাগৈতিহাসিক যুগে এই স্থান ছিল সে সব
দৈত্যাকার বিশাল প্রাণীদের বিচরণ ক্ষেত্র।
![]() |
| মালু নদী |
![]() |
| মালু নদী |
![]() |
| কমলা লেবুর বাগান |
যাই হোক, কয়েক মাস পরেই প্রকৃতিকে দেওয়া কথা রাখতে ডিসেম্বরের সকালে চললাম সালবর্ডী। আবার সেই পথ। এবার অবশ্য রাঙা পলাশকে পাওয়া গেলনা। তবে সালবর্ডীতে পৌঁছে আর একরঙের দেখা পেলাম। সরু কালো পিচের রাস্তার দু ধারের কমলালেবুর বাগানে যেদিকে তাকাই সেদিকেই দেখি উজ্জ্বল কমলা রঙের লেবুতে গাছগুলি ঝলমল করছে। এক নাগাড়ে প্রায় মিনিট পনেরো ধরে রাস্তায় পথের দুপাশের একই রূপ। লেবুর ভার সামলানোর জন্য গাছগুলিকে বাঁশের সাহায্যে বেঁধে রাখা হয়েছে। গাছের নীচে ও মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে আছে অজস্র কমলালেবু।
![]() |
| কমলা লেবুর গাছ |
![]() |
| অপরূপ প্রকৃতি |
এরপর চললাম আবার নদীর ধারে। এবার ধীরে ধীরে এগোলাম সেই পার্বত্য গুহাটির উদ্দেশ্যে। এই পথটিতে আর একটি জলধারা পেলাম। তার পাশে পাশে চলেও বুঝলাম না যে সে এল কোথা থেকে। তাই বুঝি তার নাম গুপ্তগঙ্গা। মালু নদীতেই মিশেছে গুপ্তগঙ্গা। তবে ঐ মিলন স্থলটিও নজরে পড়ল না।
পাহাড়ের ঢাল কম হলেও মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে যেতে
কষ্ট তো হবেই। থেকে থেকে এক এক জায়গায় পাহাড়ের গায়ে ধাপ কাটা। মাঝখানে একটি জায়গা এল, বেশ অনেকটা জায়গা প্রায় সমতল। রুক্ষ পাথরের। একটি ঘাসও নেই। গাঢ় খয়েরী, বেগুনি রঙা পাথুরে জায়গাটি। একটু বিশ্রাম নিলাম এখানে। মালভূমি অঞ্চল তো! আর এসব পাথর তো সেই কোন যুগে কবে জমে ছিল পৃথিবীর বুক ফেটে বেরিয়ে এসে ! সে তো অন্য হিসাব। সেখানে এই কথাটি ভাবতে ভাবতেই
দেখলাম সামনের দিকে। প্রকৃতির সেই অনাস্বাদিত রূপ আজও মনের মধ্যে জ্বলজ্বল
করছে। গাঢ় সবুজ সাতপুরা পাহাড় শ্রেনীর অপূর্ব রূপ। মাথার উপরে সুনীল আকাশ! অন্য রকমের সুন্দর প্রজাপতির দেখাও পেলাম। অদ্ভুত নিস্তব্ধতা! সেদিন মন ঐ নিস্তব্ধতার সৌন্দর্য্যকে অনুভব করেছিল। দূর থেকে অচেনা কোনোও একলা পাখির ডাক সেই নিস্তব্ধতাকে ভেদ
করে আসছিল। অন্য রকম এক অনুভূতি মনে তখন।
![]() |
| গুহার পথ |
আবার চলতে শুরু করলাম।
গুহার কাছাকাছি পৌঁছে দেখলাম
সিঁড়ি, রেলিং দিয়ে বাঁধানো। শিবরাত্রি বা অন্যান্য কোনোও সময়ে তীর্থযাত্রীদের
সুবিধার জন্য। গুহার ভিতরেও সিঁড়ি। অন্ধকার গুহাটি ২০০মিঃ লম্বা। শেষ প্রান্তে দেখা গেল প্রকৃতির স্থাপত্য কীর্তি, Stalactite ও stalagmite র। প্রাকৃতিক শিবলিঙ্গ। তার মাথায় ফোঁটা ফোঁটা জলের অবিরাম ধারা। একটি বড় শিবলিঙ্গ, ছোট ছোট অনেকগুলি।
![]() |
| গুহার সিঁড়ি |
গুহা থেকে বেরিয়ে এলাম। এবার ঘরে ফেরার পালা। এমন সব বৈচিত্র্য, বিন্যাস সেই এক জাদুকরের কথাই মনে করিয়ে দেয়। সর্বশক্তিমান, সমস্তরূপ, রস, গন্ধ, বৈচিত্র্য তাঁর দখলে। কি অসাধারণ শিল্পী! ধর্ম, দেশ, কালের গণ্ডীর কোনোও সীমারেখা দিয়ে তাঁর অসীমত্বকে বিচার করা যায় না। নির্বিকার সেই শিল্পী যুগের পর যুগ তাঁর মহান শিল্পকীর্তি রচনা করে চলেছেন!
ফিরবার পথে এই কথা গুলিই মনকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছিল। ক্ষুদ্র আমি, সীমিত আমি! হে মহান শিল্পী তোমাকে প্রণাম! তোমার বন্দনাই হয়ে উঠুক শ্রেষ্ঠ আরাধনা। সর্বশক্তিমান তুমি! বারে বারে আমি যেন তোমার অপরূপ শিল্পকর্মের নিদর্শনের সাক্ষী হতে পারি! এই আমার প্রার্থনা।








মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন